বাংলাদেশ যদি ভুটান হতো!

More(toc)

জাহাঙ্গীর হোসেনের ওয়াল থেকে!  

Jahangir's Profile

আহারে! এমন হলে কেমন হতো?

৪(caps)-বার ভুটানে বেড়াতে গিয়েছিলাম আমি। বৌদ্ধপ্রধান দেশটিতে নানাবিধ বিষয় দেখে বিস্মিত হয়েছি আমি প্রতিবারই। তুলনামূলক দরিদ্র এ দেশটি নানা প্রপঞ্চে আমার সামনে তুলে ধরেছে যে, "অভাবে স্বভাব নষ্ট" এ কথাটা একদম সত্যি নয়। ভুটানের মানুষ খুব ধনী এমনটা নয় কিন্তু তারপরও তারা খুব নির্লোভ, সৎ, অভোগবাদি। বাংলাদেশটা যদি হতো ভুটানের মত বৌদ্ধ প্রধান মানুষে ভরা, তাহলে কেমন হতো আজকের ২০২১ সনের বাংলাদেশ? রূপকল্পে দেখা যেতে পারে সে চিত্র।

পুরো বাংলাদেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জার বদলে অনেকগুলো 'গোপ্পা' বা 'প্যাগোডা' দেখা যেতো গাঁয়ের কাঁচা সড়কের ধারে। সার্ট-প্যান্ট, ধূতি-পাঞ্জাবি, পাগড়ি-টুপির বদলে অধিকাংশ মানুষ ন্যাড়া-মুন্ডু হলুদ গেড়ুয়া পোশাকে ঘুরে বেড়াতো পদ্মা কিংবা মেঘনার তীরে। পুকুর আর নদীগুলোতে সপ্তবর্ণা মাছে গিজগিজ করতো। কারণ জীব-হত্যা মহাপাপ বলে মাছ শিকার করতো না কেউই। এমনকিই চুরি করেও ধরতো না রাতের আঁধারে আজকের মত। মাঠে, বিলে, বনে-বাদারে ঘুরে বেড়াতো প্রচুর গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া কত গবাদি পশু! একই কারণে এসব পশুও হত্যা করতো না কোন বাংলাদেশি নাগরিক। অধিকাংশ মানুষ ডাল-ভাত শাক-সব্জি খেতো মাছ-মাংস বাদ দিয়ে। ওয়াজ নসিয়ত একদম শুনতে পেতেন না আপনি। সারাবছর পুজাঅর্চনা, ঢোলকাশর বাজতো না সকালসন্ধ্যা। আইএস, হেফাজত, জামাত, তাহরির, জেএমবি খুঁজতে হতো না বাংলাদেশের আনাচে কানাচে।

যাতায়াতে বাসভাড়া, লঞ্চভাড়া, ট্যাক্সি, রিক্সাভাড়া সবই সরকার নির্ধারিত সহনীয় রেটে থাকতো। যেমন ফুলসলিং থেকে পারো বা থিম্পু ৬-ঘন্টার বাস ভাড়া নিতো মাত্র ১২০ টাকা কিংবা ঢাকা-বরিশাল ট্যাক্সিতে কেবল ২০০-টাকা মাথাপিছু। কোন ট্যাক্সি বলতো না যে, মিটারে যাবোনা কিংবা জমা বেশি। কিংবা রাস্তায় পদে-পদে চাঁদা দিতে হয় পুলিশ আর সমিতির নামে। রাস্তায় ট্রাফিক বাতি আর ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও, গাড়িগুলো সব দেখে-শুনে নিজেরা আইন মেনে চলতো সৃশৃঙ্খল সভ্য জাতির মত। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় এতো মৃত্যু দেখতে হতো না হয়তো। একটা বর্বর জাতির মত এমন হতোনা ঢাকার বর্তমান ট্রাফিক ব্যবস্থার মত। মাপে কম দিতোনা কেউ, বরং ভুটানিরা গাছের এক কেজি আপেল কিনলে যেমন ২/৩টা বেশি বা প্রায় দেড় কেজি দিয়ে দেয়, তেমন দিতো মনে হয় আম, জাম, কলা ইত্যাদি। লিচু কখনো ১০০-টা কিনলে ৮০টা দিতো না বরং ১১০-টা দিতো মনে হয় আমার। ইমিগ্রেশনে সিল দিতে টাকা লাগতো না ফুল্টসলিংয়ের মতো। বরং সব অফিসেই বিনা বখশিস বা ঘুষ ছাড়াই কাজ করতো সব সরকারি কর্মচারি কর্মকর্তারা। দুর্নীতি বিরোধী বড় বড় কথা হতোনা সভা-সেমিনারে কেবল লোক দেখানো।

দেশ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিধায় পুরো দেশে সিগারেট নিষিদ্ধ হতো। তবে বিদেশি কেউ আনলে, তাকে প্রতি প্যাকেটে ৩-ডলার জরিমানা দিয়ে ঢোকাতে হতো এ সিগারেট বাংলাদেশে। আর হাসপাতালে সব রোগির জন্যে ডাক্তারগণ উদগ্রীব হয়ে বসে থাকতো, নিজ ক্লিনিকে টাকা কামানোর ধান্ধায় নয়। বিকেলে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসতো না ডাক্তারগণ। থাকতো না কোন প্রাইভেট ক্লিনিক, প্রাইভেট ফার্মেসি বা আলাদা প্রাইভেট ব্যবসাদার চিকিৎসা কেন্দ্র। রাষ্ট্র নানাবিধ বিলাসি জিনিস আমদানী করে, তার চটকদার বিজ্ঞাপন রেডিও টিভিতে প্রচার করে মানুষের লোভ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতো না, যাতে মানুষ দুর্নীতি করতে উৎসাহি হয়! বরং রেটিও টিভিতে প্রচার করা হতো অল্পতে তুষ্ট থাকুন। সুখ আসলে কিসে? আপনি নিজে সুখে থাকুন, আর আপনার প্রতিবেশিকেও সুখে থাকতে দিন। কেন মামলা মোকদ্দমা করবেন সামান্য যায়গা জমি দখল করতে স্বজন কিংবা প্রতিবেশির সাথে? মিলেমিলে সুখে থাকুন এমন কথা শেখানে হতো সমাজের সর্বত্র। 

তাই হয়তো আদালতগুলোকে এতো মামলা, এতো মারামারি দেখতে হতো না। মেয়েরা রাতে একা হেঁটে গেলেও, ধর্ষণের ভয় থাকতো না তার। প্রতিঘরে সরকার দিতো নামমাত্র দামে বিদ্যুৎ। রাস্তায় হরতাল ধর্মঘট, আগুন পোড়া বাস, মানুষ হত্যা এসব দেখতে হতোনা আমাদের। রেডিও টিভিতে সারাদিন গণতন্ত্রের জন্যে কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণও সম্ভবত চোখে পড়তো না আমাদের। আমাদের রাজাও হয়তো বিয়ে করতেন কোন সাধারণ ঘরের কৃষককন্যা। প্রজারা মানতো ঈশ্বরের মতো রাজাকে। কারণ রাজা কখনো শোষণ করতো না প্রজাদের। এ কারণে হয়তো সুইজারল্যান্ডের মত দেশ দিতো আমাদের 'অন এরাইভাল ভিসা' তাদের দেশে যেতে, গরিব বলে নয়, ভাল মানুষের জাতি বলে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ বন্ধ করতো না তাদের দেশের দরজা বাংলাদেশিদের ভ্রমণের জন্য।

সম্ভবত এতো মানুষ জন্মাতো না বাংলাদেশে। হয়তো ২-৩ কোটি হতো সাকুল্যে। তাই বিদেশি কেউ যদি বলতো আপনাকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যে - "আচ্ছা ভাই আপনার এ জমিতে কি আরেকবার ধান বা মরিচ চাষ করতে পারেন না"? আপনি হেসে বলতেন - "কেন করবো আবার? যে ধান হয়েছে, তাইতো যথেষ্ট আমার পুরো বছরের খাবার হিসেবে"।

- কেন? বেশি হলে বিক্রি করবেন?

- বিক্রি করে কি করবো?

- আরো টাকা হবে?

- আরো টাকা দিয়ে কি করবো? আমি তো ডাল-ভাত, শাকসব্জি খেয়ে ভালই আছি। আমার প্রতিবেশিও আছে আমার মত ভাল। তবে কি দরকার আর বেশি টাকায়?

এমনতো হয়তো হতো যে, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে বাস থামলো রাস্তায়, পথে খাবার হোটেলে ভুলে টেবিলে রেখে আসলেন আপনার দামি মোবাইলটা। পরদিন গিয়ে দেখলেন, ঐ হোটেলে ঐ টেবিলেই আপনার মোবাইলটি পড়ে রয়েছে, আপনি ফিরে এসে আবার নিবেন, তাই হোটেল ম্যানেজার ধরেনি আপনার ফোনটি। এটাও হয়তো হতো যে, হোটেলে খাওয়ার পর হোটেল বয় কোনভাবেই আপনার দিতে চাওয়া 'টিপস' গ্রহণ করতে চাইতো না। বাজারের সকল পণ্যই দরকষাকষিহীন একদামে পাওয়া যেতো পুরো বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত!

হ্যাঁ, এসব কষ্টকল্পনা হয়তো আজকের ২০২১ সনের দুর্নীতি আর ধর্মাক্রান্ত রোগে আসক্ত বাংলাদেশে। কিন্তু ভুটানে ওপরের সবই সত্যি পাবেন আপনি। দেখে এসেছি নিজ চোখে আমি একাধিকবার। নিজ কন্যার দামী ফোন ভুলে রেস্টুরেন্টে রেখে চলে গিয়েছিলাম প্রায় ৪০-কিমি পথ! কিন্তু ফিরে এসে দেখি সেখানেই ফোনটা, কেউ ধরেনি! ৪০-কিমি আসা-যাওয়ার অতিরিক্ত ভাড়া কিছুতেই গ্রহণ করলোনা ভুটানি ট্যাক্সি ড্রাইভার! বললো, এটাতো ভুলে হয়েছে! রেস্টুরেন্টে খেয়ে কখনো টিপস দিতে পারিনি। বরং মিনারেল ওয়াটার দিতে বললে, ওয়েটার মেয়েটা বিনয়ের সঙ্গে বললো, "এটার দাম কুড়ি রুপি, ভারতীয় পানি! কিন্তু তোমরা ফ্রিতে গ্লাসের পানি খেতে পারো। এ জল ভুটানি ঝর্ণার। খুবই পিওর আর সুস্বাদু!" এ কথা শোনার পর কার সাধ্য থাকে বাংলাদেশি বা ভারতীয় জলের বোতল কিনে খায়! যে ট্যাক্সিতে ফুল্টসলিং থেকে থিম্বু যাচ্ছিলাম, তাকে বললাম - তুমি কি কাল পরশু আমাদের নিয়ে ঘুরবে সারাদিন? বিস্মিত করে ড্রাইভার বললো, স্যার এ বর্ডার ট্যাক্সির সরকার নির্ধারিত ভাড়া ডেইলি ৮০০-রুপি, কিন্তু সিটি ট্যাক্সি পাবেন সারাদিন ৫০০-রুপি হিসেবে! তাই আমাকে নিয়ে ৩০০-রুপি লস করবেন কেন?

বড় বড় ৫/১০-তলা আলিশান এসি ভবন হয়তো নেই ভুটানিদের। দামি গাড়িও নেই সেখানে। দোকানগুলোতে খুব দামি জিনিসপত্র বা যমুনা বসুন্ধরার মত শপিংমল নেই ঝলমলে। ১/২-তলা কাঠ আর টিন দিয়ে বানানো পাহাড়ি ঘরে বাস করে অধিকাংশ ভৃুটানি। শিশুরা পাহাড়ে পাহাড়ে হেঁটে যায় তাদের স্কুলে অতি সাধারণ ভুটানি পোশাকে। এটাই নিয়ম ওখানের। গাড়ি থাকলেও কোন শিশু না হেটে গাড়িতে যেতে পারেনা স্কুলে! কারণ শিশুদের মনে তাতে discrimination তৈরি হবে বলে মনে করে ভুটানিরা। কিন্তু এ বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ তারা। হ্যাঁ, আমেরিকানদের চেয়েও সুখি মানুষ বাস করে ভুটানে। 

Jahangir Hossain
Jahangir Hossain
ধর্মান্ধতা হানাহানি রেষারেশিমুক্ত এমন দেশ কেন তৈরি হলোনা আমাদের বাংলাদেশ ! কে আর কারা বাংলাদেশকে ২০২১ সনের মিথ্যাচার, ভোগবাদী, ধর্ষক আর ধর্মান্ধ হানাহানির দেশে রূপান্তর করলো। এ দানবকে কি চিহ্নিত করতে পারবো আমরা কখনো? হয়তো পারবো, হয়তো পারবো না। তাই সামর্থ্য থাকলে একবার ঘুরে আসুন ভুটান! আর মিথ্যো এ প্রবাদকে মুছে দিন নিজ মনন, চিন্তন আর হৃদয় থেকে যে, "অভাবে স্বভাব নষ্ট"!

আরো পড়ুন>>

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

buttons=(Accept !) days=(20)

আমাদের ওয়েবসাইট আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকিজ ব্যবহার করে। দয়া করে সম্মতি দিন। Learn More
Accept !